


করোনা মহামারির প্রকোপে গৃহবন্দি সকলে, থমকে গিয়েছে প্রত্যহের জনজীবনের স্বাভাবিকতা। কাজ হারিয়েছে বহুমানুষ। অবশিষ্ট পুঁজিও "ভাঁড়ে মা ভবানী"।
দুর্বিষহ অবস্থা প্রান্তিক মানুষগুলির।গড়িয়া ও তৎসংলগ্ন বস্তি এলাকার নিম্নবিত্ত মানুষগুলির অবস্থা হতদরিদ্র হয়ে উঠেছে। ২ মুঠো মুখে তোলার সংস্থানও বিলাসিতা। এমন সময় তৈরি হলো আমাদের আলোকদিশারি। উদ্দ্যেশ্য ছিল তাদের অভাব মিটিয়ে একটু নিরাপত্তাবোধের ঘেরাটোপে নিয়ে আসা, চালডাল এসব যোগান দেওয়া। কিন্তু তাতে কদ্দিন??? দরকার পাকাপাকি ব্যবস্থা।
শুরু হল মায়েদের স্বাবলম্বী করে তোলার কাজ। মাত্র ৫ জন মেয়েদের নিয়ে শুরু হল আলোকদিশাবির পথচলা। ধীরে ধীরে কাজ চালানোর মত থেকে সেলাইয়ের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হল, ২ টো টাকার আশায় এসে জুটলো আরও অনেক এমন মেয়েরা।
সবাই তো আর সেলাইয়ের নিপুণ কারিগর নয়, তাই পসরা বড় হল-কোস্টার, ব্যাগ, এক্রাইলিক পেইন্টিং, মশলা, তা ছাড়াও হাতের কাজের আরও কত বাহারি ব্যাপার-স্যাপার।
মেয়েদের সাথে আসতো তাদের বাচ্চারাও। ঘণ্টার পর ঘন্টা বসে থাকতো মায়েদের সাথে, অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় স্মার্টফোনের অভাবে তাল না মিলাতে পেরে স্কুলছুট হয়েছে বহু পড়ুয়া, কেউবা আবার স্কুলের ফি টুকু অবধি জমা দিতে পারেনি ভাতের যোগান করতে গিয়ে।
শুরু হলো তাদের স্কুলমুখী করে তোলা। সপ্তাহে নির্দিষ্ট দিনে শুরু হল "বিনাপয়সায় শিক্ষা অভিযান"৩ জন বাচ্চাকে নিয়ে শুরু হল আলোকদিশারির স্কুলঘর। গ্যারেজে ছোট্ট ঘুপচির মধ্যে হাজারো ব্যস্ততা যেন নতুন আলোর সন্ধান দিল সেই কঠিন করোনা পরিস্থিতিতে।
ধীরে ধীরে নিউ নরমালে ফিরলাম আমরা। বড় হতে থাকলো ছোট্টচারাটা। একে একে পাশে এসে দাড়ালো কিছু উদার মনোভাবাপন্ন মানুষ, যাদের কিছু দেওয়ার বিনিময়ে কিছুর দাবি নেই। বাচ্চাদের পড়াশুনার সমান্তরালতায় মায়েদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার লড়াই।
৫ বছর পেড়িয়ে এসেছি আমরা। মনে হয় এই সেইদিনের কথা। আজ আমাদের সকল শুভাকাঙ্খীদের আশীর্বাদে আমরা সরকার অনুমোদিত একটি NGO।
গ্যারেজ থেকে আমরা পৌঁছেছি ভাড়া করা এক নতুন বাড়ির একতলায়। সেতু প্রকল্প চালু হয়েছে যাতে গড়িয়া বাদেও কলকাতার অন্যান্য অঞ্চলে আমরা পৌঁছে যেতে পারি আমাদের সাহায্য নিয়ে। আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের অর্ডার ডেলিভারি দিচ্ছে মেয়েরা। বাচ্চাগুলো কেউ কেউ সামনের বছর মাধ্যমিক দেবে। এভাবেই এখনো এগিয়ে চলেছি আমরা। এটাই আমাদের আলোকদিশারি পরিবার।
দীপাবলীর আলো যেমন আমার আপনার জীবনের অন্ধকার দুর করে দেয়, ঠিক তেমনই আলোকদিশারীর আলোও হয়ে উঠুক কারো ভরসার কাঁধ এটুকুই চাই। এই চাওয়া নিয়েই শুরু হয়েছিল পথ চলা, আর এর পূর্ণতাই আমাদের সার্থকতা।



